বৈশ্বিক তহবিল (গ্লোবাল ফান্ড) ব্যবস্থাপনা খাতের বিনিয়োগ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে চলতি দশকে নতুন বিনিয়োগ সুযোগ, বেসরকারি খাতের প্রসার ও উদীয়মান বাজারের সম্প্রসারণ খাতটিকে নতুন মাত্রায় নিতে পারে। বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপনা খাতের আকার হবে ২০০ ট্রিলিয়ন ডলার। অবশ্য সংস্থাগুলোর আওতায় সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খরচ ও প্রতিযোগিতা। এমনকি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বাবদ ফি কমানোর চাপও বাড়ছে। এসব কারণে তহবিল বাড়লেও প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনে খাতটিতে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ বজায় থাকবে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। খবর এফটি।
গ্লোবাল ফান্ড গ্রুপস বলতে সাধারণত তহবিল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বোঝায়। এসব তহবিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও বাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ লগ্নি করে এবং ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে। তাদের সেবায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ফান্ড, ইএফটি, প্রাইভেট ইকুইটি, রিয়েল এস্টেটসহ নানা ধরনের বিনিয়োগ। তহবিল ব্যবস্থাপনা খাতের বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাকরক, ভ্যানগার্ড, ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টস, স্টেট স্ট্রিট গ্লোবাল অ্যাডভাইজারস, জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, গোল্ডম্যান স্যাকস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, ইউবিএস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, অ্যামুন্ডি ও অ্যালায়েন্স গ্লোবাল ইনভেস্টরস।
পিডব্লিউসির সাম্প্রতিক এ সমীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৩০০ জন সম্পদ ব্যবস্থাপক, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও ডিস্ট্রিবিউটর। তারা জানান, প্রাইভেট মার্কেট থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তহবিল ব্যবস্থাপনা খাতে আয় পৌঁছাতে পারে ৪৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারে। এতে ভূমিকা রাখবে উচ্চ মুনাফার প্রত্যাশায় ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং খাতটিতে উচ্চ সম্পদধারী ব্যক্তির পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রবেশ।
পরিসংখ্যান অনুসারে গত বছর বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপনা খাতের আকার ছিল ১৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এটি ২০৩০ সাল নাগাদ বেড়ে হবে ২০০ ট্রিলিয়ন ডলার। ওই সময় প্রাইভেট মার্কেট থেকে আসবে তহবিল ব্যবস্থাপনা খাতের আয়ের অর্ধেক।
পিডব্লিউসি ইউকের গ্লোবাল অ্যাসেট অ্যান্ড ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান অলবার্থা চার্লস বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে, শিগগিরই বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও সুদহার ধীরে ধীরে কমবে। এতে নগদ সঞ্চয় না করে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে মানুষ।’
খাতটির আকার বাড়লেও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মুনাফার ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে, এমনটা বলা হচ্ছে পূর্বাভাসে। কারণ ব্যবস্থাপকদের খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ছে প্রতিযোগিতা। বেশি গ্রাহক পেতে ফান্ডগুলো এখন ফি কমানোর দৌড়ে শামিল হয়েছে।
৮৯ শতাংশ সম্পদ ব্যবস্থাপক গত পাঁচ বছরে মুনাফা অর্জনে চাপ অনুভব করেছেন। ভবিষ্যতেও সেই চাপ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পিডব্লিউসির বিশ্লেষণ। ২০১৮ সালের তুলনায় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মুনাফা কমেছে ১৯ শতাংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে মুনাফা কমতে পারে ৯ শতাংশ।
অলবার্থা চার্লস বলেন, ‘আমরা আশা করি খাতটিতে সম্পদ বৃদ্ধির মূল ভিত্তি হবে প্রাইভেট মার্কেট। কিন্তু শুধু সম্পদ বা আয় বাড়লেই মুনাফা বেশি হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। যে ফান্ডগুলো ব্যবসার মডেল পুনর্গঠন করবে তারাই ভবিষ্যতে লাভবান হবে। অন্যদের তুলনায় বিশেষ কী সুবিধা দিচ্ছে তা বিনিয়োগকারীদের স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রাইভেট ইকুইটি, প্রাইভেট রিয়েল এস্টেট, ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মতো তহবিলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমছে। সরকার ও নীতিনির্ধারকরাও বিকল্প বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের সহায়ক পদক্ষেপ নিচ্ছে। মার্কিন সরকারের নীতির কারণে এখন থেকে ‘৪০১কে রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান’ বা অবসর তহবিলগুলো এ ধরনের বিনিয়োগে অংশ নিতে পারবে।
এছাড়া একক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাইভেট মার্কেট আরো বেশি উন্মুক্ত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে লং টার্ম অ্যাসেট ফান্ড ও ইউরোপে এ ধরনের পরিষেবা এসেছে, যেখানে বিনিয়োগকে সহজে নগদে রূপান্তর করা যাবে। তাৎক্ষণিক এ সুবিধা এতদিন পুঁজিবাজারে পাওয়া যেত।
পিডব্লিউসির প্রতিবেদন আরো বলছে, একই সময় প্যাসিভ ফান্ডও দ্রুত সম্প্রসারণ হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ এসব ফান্ডের আওতাধীন সম্পদের আকার পৌঁছবে ৭০ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা গত বছর ছিল প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার। এসব ফান্ড সাধারণত পুঁজিবাজারের কোনো একটি সূচক অনুসরণ করে রিটার্ন দেয়। স্টকপিকার ফান্ডের তুলনায় এখানে ফিও কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ ফি থাকার কারণে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ফান্ড ম্যানেজার পরিবর্তন করে কম খরচের তহবিল যাচ্ছেন। এতে বিনিয়োগ বাবদ তাদের খরচের চাপ কমছে।
অলবার্থা চার্লস আরো বলেন, ‘ধনীদের গ্রাহক হিসেবে পেতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। কারণ এ ধরনের গ্রাহকশ্রেণী খুবই দ্রুত বাড়ছে ও তাদের বিনিয়োগের আকারও আকর্ষণীয়।’
অঞ্চলভিত্তিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করে পিডব্লিউসি দেখেছে, আগামী বছরগুলোয় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এ শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটতে পারে। এতে বড় ভূমিকা রাখছে অঞ্চলটিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্প্রসারণ। এছাড়া জাপানে গৃহস্থালির সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরে ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা খাতটিতে ভূমিকা রাখবে।